সুনামগঞ্জের হাওরবেষ্টিত দিরাই উপজেলার কালনী নদীর ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ‘জগদল ব্রিজ’। কিন্তু ব্রিজের দুই পাড়ে গেলেই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। দিরাই-জগদল সড়কটি এখন আর কোনো যাতায়াতের পথ নয়, বরং হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর বঞ্চনার এক জীবন্ত দলিল।
উপজেলা সদরের সাথে জগদল ও করিমপুর ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী জগন্নাথপুর উপজেলার আরও দুটি ইউনিয়নের সেতুবন্ধন এই সড়ক। অথচ বছরের পর বছর ধরে সংস্কারহীন পড়ে থাকা এই রাস্তাটি এখন নিজেই ‘মরণাপন্ন রোগী’।
প্রতিশ্রুতির বন্যা, উন্নয়নের খরা
নির্বাচন এলে নেতাদের মুখে প্রতিশ্রুতির তুবড়ি ছোটে, হাওরপাড়ের সহজ-সরল মানুষগুলো নতুন করে স্বপ্ন বুনে। কিন্তু ভোট শেষ হলে দৃশ্যপট বদলায় না। বদলায় না জগদল ও পূর্ব দিরাইয়ের অবহেলিত মানুষের ভাগ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, “নেতা আসে, নেতা যায়; শুধু কাদা আর গর্তের রাজত্ব শেষ হয় না।”
বাস্তবতার নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পিচ-খোয়া অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে। বিশাল সব গর্তে জমে আছে হাঁটু জল। ৬৫ বছর বয়সী পথচারী নির্মল দাসের কণ্ঠে ঝরল একরাশ আক্ষেপ। তিনি বলেন:
”সেই পাকিস্তান আমল থেকে দেখরাম বাবা, এই রাস্তা যেলা আছে অলাউ। টিভিতে দেখি দেশ অনেক উন্নত অইছে, কিন্তু আমরার ভাগ্য তো আগের লাখানই রইল।”
শিক্ষার্থীদের কষ্ট আরও চরমে। স্কুলছাত্র শাব্বির জানায়, প্রতিদিন কাদা মাড়িয়ে তাদের স্কুল-কলেজে যেতে হয়। বাড়ি ফেরার পর পোশাকের যে অবস্থা হয়, তা দেখে মনে হয় তারা কোনো যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরেছে।
পণ্য পরিবহনে ভোগান্তি, চড়া দাম
পিকআপ চালক মুক্তাদির হোসেনের জীবন কাটে এই ভাঙাচোরা পথে স্টিয়ারিং ধরে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়া জগদল, হুসেনপুর বা রতঞ্জ বাজারে যাওয়া মানে নিজের আয়ু কমানো। দেশে তেল-গ্যাসের দাম বাড়ে, কিন্তু আমরার জীবনের আর এই রাস্তার কোনো দাম নাই।”
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন: আমরা কি ভিনগ্রহের?
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় কোনো মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়। খানাখন্দে ভরা এই রাস্তায় প্রসূতি মা কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দিরাই সদরে নিতে গিয়ে অনেক সময় পথেই অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
এলাকাবাসীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন—যেখানে সারা দেশে উন্নয়নের জয়গান গীত হচ্ছে, সেখানে দিরাই-জগদল সড়কের এই দশা কেন? তারা কি বাংলাদেশের মানচিত্রের বাইরের কেউ, নাকি তাদের ভাগ্যে উন্নয়ন কেবলই এক অলীক স্বপ্ন?
https://slotbet.online/