দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা, পাখি শিকার ও নিধন বন্ধ এবং এলাকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় ‘বিহঙ্গ বিলাস’ নামে জেলার দ্বিতীয় পাখির কলোনি ঘোষণা করা হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেনের নির্দেশনায়, দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধার উদ্যোগ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং সামাজিক বন বিভাগ, দশমিনার সমন্বয়ে উপজেলার সাগর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় এ পাখির কলোনি ঘোষণা করা হয়। এ সময় পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে এলাকাটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করে একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাগর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় পাখি নিয়মিত বসবাস, বাসা তৈরি ও প্রজনন করে আসছে। বিশেষ করে বিভিন্ন মৌসুমে এসব পাখির আনাগোনায় পুরো এলাকাটি হয়ে ওঠে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি পাখির বাসা থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ায় পাখির স্বাভাবিক প্রজনন ও নিরাপদ আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়ে।
বিষয়টি পরিবেশবাদী ও প্রাণিকল্যাণ সংগঠনের নজরে আসার পর প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে পাখির আবাসস্থলটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসন ও সামাজিক বন বিভাগের সমন্বয়ে এলাকাটিকে ‘বিহঙ্গ বিলাস’ নামে পাখির কলোনি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী স্বেচ্ছাসেবী প্রাণিকল্যাণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সভাপতি মো. সোহেল হোসেন রাসেল বলেন, “কিছুদিন আগে আমাদের কাছে তথ্য আসে যে, দশমিনা উপজেলার সাগর চেয়ারম্যান বাড়িতে বহু বছর ধরে পাখির আবাসস্থল রয়েছে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়মিত আসে, বাসা তৈরি করে এবং বংশবিস্তার করে। কিন্তু কিছু অসাধু লোক পাখির বাসা থেকে বাচ্চা ধরে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলে। এতে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল ও প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন দশমিনা ও সামাজিক বন বিভাগ, দশমিনার সমন্বয়ে এই বাড়িটিকে পাখির কলোনি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ‘বিহঙ্গ বিলাস’ নামে একটি বিলবোর্ড স্থাপন করে স্থানটিকে পাখি ও বন্যপ্রাণীর জন্য সংরক্ষিত ঘোষণা করা হচ্ছে।”
সোহেল হোসেন রাসেল বলেন, “পাখি আমাদের প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাখি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই পাখি শিকার, আটক, নিধন কিংবা খাওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। এসব কর্মকাণ্ড আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি অনুরোধ জানাই, এই স্থান থেকে আর কোনো ধরনের পাখির ক্ষতি করা যাবে না।”
তিনি জানান, পাখির আবাসস্থল রক্ষায় শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়রা যদি পাখির বাসা, ডিম ও বাচ্চা রক্ষা করেন এবং কোনো ধরনের শিকার বা নিধন না করেন, তাহলে এলাকাটি ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাখির আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘বিহঙ্গ বিলাস’ এলাকায় পাখিদের নিরাপদ বিচরণ, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে পাখি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে পাখির বাসা নষ্ট করা, ডিম বা বাচ্চা সংগ্রহ, পাখি শিকার, আটক কিংবা বিক্রির মতো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পটুয়াখালীতে দ্বিতীয় পাখির কলোনি
পরিবেশবাদী সংগঠন অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর আগে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কলাপাড়া উপজেলায় একটি পাখির কলোনি ঘোষণা করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় দশমিনায় ‘বিহঙ্গ বিলাস’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে পটুয়াখালী জেলায় পাখির জন্য দ্বিতীয় কলোনি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলো।
স্থানীয় পাখিপ্রেমী ও পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, উন্নয়ন ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে দিন দিন অনেক পাখির প্রাকৃতিক আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। ফলে পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। দশমিনার ‘বিহঙ্গ বিলাস’ উদ্যোগটি সফল হলে এটি শুধু পাখি সংরক্ষণ নয়, পুরো এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তাদের মতে, একটি এলাকায় পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি হলে সেখানে শুধু পাখির সংখ্যাই বাড়ে না, বরং পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। পাখি কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, বীজ বিস্তারসহ প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তাই পাখিকে রক্ষা করা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা।
প্রশাসন ও পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে—পাখির বাসা ভাঙা, ডিম ও বাচ্চা সংগ্রহ, পাখি শিকার, আটক কিংবা কোনোভাবে পাখির ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ড করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে।
দশমিনায় ‘বিহঙ্গ বিলাস’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাখি সংরক্ষণে নতুন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন, পাখিপ্রেমী এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই কলোনি একসময় দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পাবে।




