শিক্ষা

দেওবন্দ থেকে সৈয়দপুর: এক সন্ধ্যার নূরানি সিলসিলার দরস

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শায়খ মুফতি শাহ মুতিউর রহমান চৌধুরী · শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬ · ৪:২২ পিএম

 

​আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাছিরান তায়্যিবান মুবারাকান ফীহি।
​গত ২ জুলাইয়ের সন্ধ্যাটি আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য এক পরম সৌভাগ্য হিসেবে কবুল করেছিলেন। জামিয়া দারুল হাদিস সৈয়দপুরের সম্মানিত মুদিরে জামিয়া, হযরত মাওলানা হাফিজ সৈয়দ ফখরুল ইসলাম সাহেব (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মোবারক সোহবতে কাটে সেই অনন্য সময়।

​মাগরিব থেকে এশা—এই দীর্ঘ সময়টি ছিল শুধুই তাঁর অমৃত বচন শোনা আর হৃদয়ের পাত্রে দুআ কুড়ানোর। হুজুরের নূরানি জবান থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি কথা যেন ছিল একেকটি মূল্যবান মুক্তো।

​ইলমী সিলসিলা ও জামিয়ার অগ্রগতি
হযরত মুদিরে জামিয়া স্বভাবসুলভ বিনয় ও সরলতায় বললেন, “জামিয়া হিদায়াতুল ইসলাম সিলেট আজ যে মর্যাদাপূর্ণ মাকামে পৌঁছেছে, তা শুধুই শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর ফয়েজ ও বরকতের ফসল।”

​আলাপচারিতায় জানতে পারলাম, হুজুরের পরম শ্রদ্ধেয় উস্তাদ ছিলেন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)-এর সুযোগ্য শাগরিদ, হযরত মাওলানা রিয়াসত আলী তৈইপুরী (রহ.)। সিলেটের পুণ্যভূমিতে ইলমের এই সুউচ্চ নেসবত ও সংযোগ সত্যিই আমাদের জন্য এক মহান গৌরব।

​আধ্যাত্মিক সফরের এক জাদুকরী অধ্যায়
মজলিসে হুজুরের বায়আতের কাহিনীটি আমার হৃদয়কে সবচেয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
তিনি প্রথমে খলিফায়ে মাদানী, কায়িদে উলামা হযরত শায়খে কৌড়িয়া (রহ.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর, আওলাদে রাসূল, ফেদায়ে মিল্লাত (রহ.)-এর কাছে বায়আত ও দারুল উলুম দেওবন্দে এতেকাফের নিয়তে ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর দরগাহ মসজিদের ইমামতি থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে বের হন।
​কিন্তু তাকদিরের লিখন ভিন্ন ছিল! ভিসা জটিলতায় সেবার দেওবন্দ যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তিনি হতাশ হননি। অবশেষে খলিফায়ে মাদানী, মাদফুনে মাক্কি, মুহিউস সুন্নাহ হযরত শায়খে গাজিনগরী (রহ.)-এর মোবারক হাতে বায়আত হন এবং তাঁর কাছ থেকেই অর্জন করেন ইলমে তাসাউফের খেলাফত ও ইজাজত।

​হযরতের আগামীর স্বপ্ন ও ফিকির
হুজুরের হৃদয়ের গভীর এক তামান্না ও স্বপ্নের কথা শুনলাম। আগামী ২০২৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর জামিয়ার ‘৫২ সালা দস্তারবন্দী’ উপলক্ষে একটি আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলনের পরিকল্পনা চলছে। এই ঐতিহাসিক আয়োজনকে সফল করার জন্য হুজুরের গভীর ফিকির ও পরামর্শগুলো শুনছিলাম। এই আয়োজন কেবল একটি উৎসব নয়, এটি এক মহান ঐতিহাসিক আমানত।

​প্রসঙ্গক্রমে হুজুর গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করলেন জামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, খলিফায়ে মাদানী আল্লামা আব্দুল খালিক (রহ.) ও আল্লামা সৈয়দ তখলিস হুসাইন (রহ.)-এর রক্ত-ঘাম আর ত্যাগের কথা। আজ আমরা যা কিছু দেখছি, তা তাঁদেরই জিলানি কুরবানীর সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

​
জামিয়া আরাবিয়া হোসাইনি দারুল হাদিস সৈয়দপুরের শিক্ষার্থীদের তালিম-তারবিয়াতের মানোন্নয়নে হুজুর কিছু মূল্যবান নসিহত করলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন—”ইলমের সাথে যদি আদব না থাকে, তবে সেই ইলম জীবনের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।” হুজুরের এই হিকমতপূর্ণ কথাটি হৃদয়ের মণিকোঠায় গেঁথে রাখার মতো।

মজলিসের শেষলগ্নে হুজুর পরম স্নেহে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন: “ওবা মুতিউর রহমান, মন দিয়া শুনো। আজ থেকে তোমার সাথে আমার নতুন আরেকটা সম্পর্ক কায়েম হলো। আল্লাহ তায়ালা তোমার ইলম ও আমলে বরকত দান করুন।”

উপস্থিত আমরা সকলে সমস্বরে বলে উঠলাম—আমীন, ছুম্মা আমীন।
​সবশেষে এশার আজানের পর হুজুরের দস্তরখানের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য হলো। প্রবাদ আছে না—”উলামায়ে কেরামের ঘরের অন্ন আর জবানের নসিহত, দুই-ই অন্তরের শেফা।”

​হযরতুল উস্তাদ হাফিজ মাওলানা শায়খ সৈয়দ ফখরুল ইসলাম সাহেব (দা.বা.), আল্লাহ তায়ালা জামিয়ার খিদমতে আপনার দীর্ঘ ৪৫ বছরের অবিরাম মুজাহাদাকে কবুল করুন। আপনার হায়াত, ইলম ও আমলে প্রভূত বরকত দিন এবং আমাদের এই সিলসিলার সাথে আজীবন জুড়ে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন, ছুম্মা আমীন।

  • শায়খ মুফতি শাহ মুতিউর রহমান চৌধুরী
    মুহতামিম: জামিয়া হিদায়তুল ইসলাম সিলেট।।

সম্পর্কিত সংবাদ