• বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ সংবাদ
সুনামগঞ্জে টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউজবোটে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সাংবাদিক কাজী মমতাজের মাতার রুহের মাগফেরাত কামনায় ১০ম মৃত্যু বার্ষিকীতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল শান্তিগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা নববর্ষ বরণ তুচ্ছ ঘটনায় মাসুক মেম্বার ও হোসাইন বাহিনীর তাণ্ডব: দিনমজুর আহাদনুর খু*ন, দুই সন্তান নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী শান্তিগঞ্জে শিক্ষকের বিরুদ্ধে তরুণীর অনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ শান্তিগঞ্জে রওজাতুল কুরআন মাদরাসায় অভিভাবক সমাবেশ ও প্রবাসী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান স্থান পরিবর্তন করে পাগলা বাজারে নতুন করে ভিশন শো রুমের উদ্বোধন শান্তিগঞ্জে শিক্ষা সপ্তাহ ও বিজ্ঞান মেলায় পুরস্কার পেল আক্তাপাড়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ছাতকে দাখিল পরিক্ষার্থীদের সফলতা কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত শহীদ আবু সাঈদ হ*ত্যা*য় দুজনের মৃ*ত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন শান্তিগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন: মামলাবাজির অভিযোগে হয়রানির শিকার পরিবার, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের জনৈক ছাত্রকে উপদেশ ও এর প্রতিক্রিয়া এবং আমার কিছু স্মৃতিচারণ

রিপোর্টার নাম : / ৪৩৯ সময় :
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০২৫

◑ সৈয়দ মবনু ◑ কবি ও গবেষক 

সিলেটে দুজন মাওলানা শফিকুল হক ছিলেন আমাদের ছোটবেলা। যাদেরকে নিয়ে আমি প্রায় মুশাব্বায় আটকে যেতাম। একজন হলেন মাওলানা শফিকুল হক আকুনি, অন্যজন মাওলানা শফিকুল হক আমকুনি। দীর্ঘদিন পর আমার বুঝে আসে আমি যাকে চাচা ডাকি, তিনি সিলেট সোবহানীঘাট মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামীম মাওলানা শফিকুল হক আমকুনি। আর যিনি সিলেটে দেওবন্দীদের ইতিহাস সংরক্ষক বলে খ্যাত ছিলেন, তিনি হলেন সিলেট জামে মসজিদের সাবেক খতিব মাওলানা শফিকুল হক আকুনি।

তারাই ছেলে শায়খুল হাদিস উবায়দুল্লাহ ফারুক,
যিনি বর্তমানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি। শায়খুলহাদিস উবায়দুল্লাহ ফারুককের সাথে আমার কোনদিন দেখা হয়নি। তবে তাঁর বাবা’র প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা ছিলো বলে আমি তাঁকেও শ্রদ্ধার চোখে দেখি। তাঁর বাবার মতোই তিনি খুব স্পষ্টভাষি একজন মানুষ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। যে বাবার সন্তান তিনি, পারিবারিক ভাবেও পড়শোনা থাকারই কথা। বক্তব্য শোনলেও মনে হয় লেখাপড়া আছে। লেখাপড়া থাকা আর লেখাপড়াকে বুঝা দুই জিনিষ, মনে হয় মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের মধ্যে লেখাপড়া বুঝার শক্তিও রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের ধরণও বলে তিনি পন্ডিত প্রকৃতির মানুষ। তাঁর কিছু বক্তব্য নিয়ে ফেসবুকে আলোচনা হচ্ছে। যেমন একটি বক্তব্য তিনি তাঁর জনৈক ছাত্রকে জেল থেকে মুক্তির পর ব্যক্তিগতভাবে শাসনের বা উপদেশের সুরে বলেছিলেন, ‘তোমরা তো দ্বীনি কোন বিষয়ে জেলখানায় যাওনি, হুটহাট মাথা গরম করে সিদ্ধান্ত নিয়ে হুকুমতের বিরুদ্ধে লেগে গেছো, হুকুমতের বিরুদ্ধে লড়তে হয় মাথা খাটিয়ে। বর্তমানে হাসিনার সাথে লড়তে হবে বুদ্ধি দিয়ে। তোমরা যেভাবে হুকুমতের বিরুদ্ধে লড়াই করছো এটা বোকামী।’

তিনি নাকি আরো বলেছিলেন, ‘তোমার ইলম অনুযায়ী মাঠে বক্তব্য দিবা, এটা করে ফেলবো-সেটা করে ফেলবো’ এইসব কথা বলে জনগনকে একটু মজা দেয়া যায়, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যেটা সাধারণ মানুষকে দ্বীন শিখানো; সেটা হয়না। এই জন্য মাঠে এমন কথা বলবা যাতে সাধারণ মানুষের ফায়দা হয়।’ তখন কেউ একজন নাকি বলেছিলেন ‘সাহেব, অমুক মাওলানা খুব সুন্দর আলোচনা করেন।’ প্রত্যুত্তোরে শায়খুলহাদিস উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেব নাকি বলেছিলেন, অমুক সাবের যে ইলম সেটা তো আর এই মাওলানার নাই।’ তখন তিনি এই ছাত্রকে নাকি বলেছিলেন; ‘তুমি বরং বিষয়ভিত্তিক মুতাআলা করে আলোচনা করবা।’

এই ছাত্রের নাকি উপদেশগুলো বদহজম হয়েছে। সে প্রকাশ্য সমালোচনা করছে সেখান থেকে বেরিয়ে। সে নাকি এই উপদেশের কারণে লজ্জিত হয়েছে এই শায়খুলহাদিসের কাছে বোখারী পড়ে। কথাগুলো শোনে আমার মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.) এর মাকতুবাতের (পত্রসমূহের) কথা স্মরণ হলো। তিনি তাঁর এক শিষ্যকে উপদেশ দিয়েছিলেন; ‘তুমি ইস্তেখারা ছাড়া কাউকে শিষ্য করো না। যদি কারো নেওয়ার যোগ্যতা না থাকে আর তুমি দিতে চেষ্টা করো তবে তোমার সময় নষ্ট হবে। প্রত্যেককে কিয়ামতের মাঠে সময়ের হিসাব দিতে হবে।’

স্মরণ হয়েছে, শায়খুলহাদিস আব্দুল আজিজ দয়ামিরী (র.) এর জীবনের একটি ঘটনা। আমরা তখন সিলেট দারুস সালাম মাদরাসার ছাত্র। দয়ামিরী হুজুর তখন নায়বে মুহতামীম ও শায়খুলহাদিস। মাওলানা নুর উদ্দিন গহরপুরী (র.) তখন মাদরাসার মুহতামীম। গহরপুরী তো মাদরাসায় হঠাৎ আসতেন। একদিন এভাবে এসে দেখেন দয়ামিরী হুজুর বাড়ীতে। জানতে চাইলেন; দরখাস্ত কি দিয়েগেছেন? কেউ কিছু বলতে পারলেন না। আমরা ভাবছি তিনি আবার কাকে দরখাস্ত দিয়ে যাবেন? নিজেই তো মুহতামীমের মতোই নায়বে মুহতামীম। তা ছাড়া এই মাদরাসার সকল শিক্ষক তাঁর ছাত্র। গহরপুরী হুজুর তখন দয়ামীরের একজন ছাত্রকে ডেকে বললেন, যাও দয়ামিরের সাবকে বাড়ীথাকি লইয়া আও।’ সম্ভবত সেই ছাত্র মাওলানা আতাউল গনি বা মাওলানা আব্দুল বাসিত খসরু ছিলেন। তিনি গেলেন এবং এশার একটু পরে দয়ামিরী হুজুর এসে উপস্থিত। মাদরাসায় এশার জামায়াত হতো একটু দেরিতে, তখন আমরা এশার নামাজ শেষে হযরত গহরপুরীর নসিহত শোনছি। দয়ামিরী হুজুর মাতা নীচু করে সামনে এসে বসলেন। গহরপুরী হুজুর তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে দয়ামিরীকে আঘাত করে বললেন; ও মওলুবী কারে জিগাইয়া বাড়ীত গেছলায়? দয়ামিরী হুজুর নিরব এবং মাথা নিচু করে মাফি চাইলেন। একটি শব্দও করলেন না। জীবনেও কোনদিন এবিষয় নিয়ে কথা বলতে দয়ামিরীকে শোনিনি। অথচ হযরত দয়ামিরী (র.) এর ইলম ও রাগের খবর এই সিলেটের সকল আলেমের জানা ছিলো। অনেক বড় বড় আলেমও তাঁকে সম্মান ও ভয় করতেন। আমরা ছাত্ররা তো আজীবন হুজুরের সামনে যেতে ভয় করতাম।
সম্ভবত ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক বিক্রমে আমার একটা লেখা নিয়ে দয়ামিরী হুজুর ক্ষুব্ধ হলেন। লেখাটা ছিলো চার দলে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের যোগদান প্রসঙ্গে। তখন আমি শায়খুলহাদিসের পক্ষে দারুল উলূম দেওবন্দ ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের কাজের উপমা দিয়েছিলাম। এতে হুজুর রেগে যান। তিনি দেওবন্দ বা দেওবন্দের কোন উস্তাদের সমালোচনা শোনতে পারতেন না। আমি তখন ইংল্যান্ডে। হুজুর তাঁর রাগের কথা আমার বাবাকে জানান। আমার বাবাও তাঁর মতো দেওবন্দী চিন্তার মানুষ। টেলিফোনে বাবা অনেক ধমক দিলেন। ২০০০খ্রিস্টাব্দে হজের সময় মক্কায় ইবরাহিম খলিল রোডের দিকে হরমের সামনে দয়ামিরী হুজুরের সাথে আমার দেখা। হুজুরের হাতে লাঠি। আমি সালাম দিতেই তিনি লাঠি উঠিয়ে বললেন; তোমাকে মনে হয় লাঠি দিয়ে পিঠিয়ে লাশ করে দিতাম, কাবার সামনে কিছুই বলতে পারছি না। আমি হুজুরের লাঠির নীচে ধরে আমার হাতে উঠিয়ে বললাম, এখানেই শাস্তি দিন আমার ভুলের জন্য, এতে আল্লাহ আমাকে মাফ করে আরও বরকতময় করে দিবেন। হুজুর আমাকে বুকে জড়িয়ে বউ-বাচ্চার খবর নিলেন। এরপর তিনি জানালেন, আমার শশুড় মাওলানা আহমদুল হক (খতিব উবায়দুল হকের বড়ভাই) নাকি তাদের বাড়ীতে লজিং থেকে দয়ামির মাদরাসায় পড়েছেন। না, আমার তো কোনদিন হুজুরের উপর রাগ আসেনি। হুজুরের ইন্তেকালের কিছুদিন আগে আমি আমার বাবা আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমান ও ছেলে সাইয়্যিদ মুজাদ্দিদকে নিয়ে তাঁর বাসায় যাই। তিনি মুজাদ্দিদকে কুলে বসিয়ে আমার ছোটবেলার দুষ্টামীর স্মৃতিচারণ এবং তাঁর শাসনের কথা বলতে থাকেন। আমরা এখনও গর্ব করি হুজুরের শাসনের আলোচনা করে। আমাকে আরেকজন বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরও খুব শাসন করতেন, তিনি শায়খুলহাদিস মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী (র.)। আমার কেন জানি মনে হয় এজন্যই গাছবাড়ী হুজুরের প্রতি আমার খুব প্রেমও ছিলো। আমার বয়স এখন ৫৫ বছর। কেউ যখন প্রশ্ন করে সৈয়দ মবনু তোমার যোগ্যতা কি? তখন সহজ করে বলি; আমি আজীবন মুরুব্বীদের পায়ের কাছে বসেছি আর তারা আমার মাথায় হাত রেখেছেন। এই আমার যোগ্যতা।

দুঃখ হয় এই বয়সে এসে এখন শাসন আর উপদেশ দেওয়ার মতো মানুষের খুব অভাব। ভুল ধরে শাসন করার মানুষ কম বলে এখন খুব একটা ঘর থেকে বের হই না। মনে হয় ভুল ধরার মানুষ না থাকলে ভুল হবে বেশি। মাঝেমধ্যে বন্ধু-বান্ধব বা ছোটদেরকে বলি; এহতেসাব বা আত্মসমালোচনার উদ্দেশ্যে আমার ভুল ধরতে। কেউ কেউ কথা শোনেন। কেউ কেউ মুসকি হাসেন। কেউ কেউ বলেন; আমি আর কি ভুল ধরবো আপনার? অবশ্য ফেসবুকে অনেকে অনেক কথা বলেন। তাদের অনেক কথা সত্য না হলেও আমি নারাজ হই না। এগুলো সম্পর্কে হুশিয়ার থাকতে চেষ্টা করি। যারা আমার সমালোচনা করেন, আমি মনে করি তারা আমাকে ভালোবাসেন, তাই ভুল ধরে দিতে সমালোচনা করেন।
জাযাকাল্লাহ ওয়া আহসানাল জাযা, খুব ভালো লাগছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরোও দেখুন....
https://slotbet.online/