••দেলোয়ার হোসেন••
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী ইউনিয়নের এক অজ পল্লীতে দাঁড়িয়ে আছে একটি আলোকিত প্রতিষ্ঠান—রূপসদী মাহবুবুর রহমান মেমোরিয়াল হাসপাতাল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মুখে এখন একটি নাম—যেখানে সেবা আছে, যত্ন আছে, আর আছে চিকিৎসার আশ্বাস।
শহর বা মফস্বলের বাইরে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার কথা বলতে গেলে এখনো অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু সেই ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করেছে এই হাসপাতাল। একটি পরিপূর্ণ ও মানবিক উদ্যোগ কীভাবে একটি অঞ্চলের জীবনযাত্রা বদলে দিতে পারে—তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি।
•প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প•
২০০৬ সালে প্রয়াত মাহবুবুর রহমানের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে তার পরিবার এই হাসপাতালটি গড়ে তোলে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সম্পূর্ণ অলাভজনক কাঠামো এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এটি নির্মিত হয়। পরিবারটি প্রায় ২৫ লাখ মার্কিন ডলার নিজস্ব অর্থায়নে বিনিয়োগ করে হাসপাতালটির ভিত্তি গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—গ্রামের মানুষ যেন চিকিৎসা পায়, সম্মান পায়, আরেকটু ভালোভাবে বাঁচতে পারে।
এই হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে সিএসআর ভিত্তিক (Corporate Social Responsibility) মডেলে, যেখানে লাভ নয় বরং মানুষের সেবাই মুখ্য।
•আধুনিক সুযোগ-সুবিধা•
হাসপাতালটি বর্তমানে ৬৫ শয্যার এবং প্রতিদিন গড়ে ১০০-১২০ জন রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন:
Siemens এক্স-রে মেশিন
4D আল্ট্রাসনোগ্রাফি
ইকো-ডোপলার
ECG
Elisa
সম্পূর্ণ অটোমেটেড ল্যাবরেটরি,
আধুনিক অপারেশন থিয়েটার,
ফার্মেসি ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা রয়েছে।
NICU (নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) এবং হার্টের রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল প্রকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা এই প্রত্যান্ত অঞ্চলে ভাবতে গেলেই অনেক কিছু।
এছাড়াও আছে ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা সুবিধা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এখানে চিকিৎসক ও নার্সদের আচরণ অত্যন্ত মানবিক এবং আন্তরিক। রোগীরা শুধু ওষুধই নয়, সান্ত্বনাও পান।
•নারীদের উন্নয়নে নার্সিং ইনস্টিটিউট•
২০১৪ সালে হাসপাতালের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট। এখানে স্থানীয় মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে তৈরি করা হয়। ফলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসেবা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, তেমনি তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বীও হচ্ছেন। অনেকেই এখন শহরে চাকরি করছেন, আবার কেউ কেউ এই হাসপাতালেই চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন।
•সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন•
এই হাসপাতালকে ঘিরে রূপসদী গ্রামে ঘটেছে এক আশ্চর্য পরিবর্তন। আগের সেই নির্জন রাস্তা এখন ব্যস্ত। হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে ঔষধের দোকান, চা-হোটেল, ফটোকপি দোকান, খাদ্যদ্রব্যের হকার। একটি ব্যাংকের শাখাও চালু হয়েছে এই হাসপাতালে আসা-যাওয়া করা মানুষের কারণে।
•স্বীকৃতি ও সম্মাননা•
হাসপাতালটি ২০০৮ সালে অর্জন করে Standard Chartered – The Financial Express CSR Award। এই পুরস্কার সমাজসেবায় সত্যিকারের অবদানের স্বীকৃতি। দেশের অনেক বড় হাসপাতাল থেকেও এই প্রতিষ্ঠানটি আলাদা কারণ এখানে শুধুই মানুষের জন্য কাজ হয়।
•আলোকিত প্রত্যন্ত চিকিৎসাসেবা; রূপসদী ‘মাহবুবুর রহমান’ মেমোরিয়াল হাসপাতাল লক্ষ্য•
পরিচালনা পরিষদের মতে, হাসপাতালটিকে আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে ডায়ালাইসিস ইউনিট, শিশু বিভাগ ও ক্যান্সার স্ক্রিনিং সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া নতুন একটি ব্লাড ব্যাংক ও আইসিইউ চালুর কথাও ভাবা হচ্ছে।
সমালোচনা:
বিভিন্ন সময় রোগীদের মতামত থাকে কেবল ডাক্তার দেখানোর ক্ষেত্রে সিরিয়ালের ত্রুটির কারনে ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকে। তবে এই বিষয়ে হাসপাতাল কতৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেয়া হয় এবং
তারা তা খুব শীগ্রই সঠিক নিয়মে আনবে বলে আমাদের আশংকা দেন।
•উপসংহার•
রূপসদী মাহবুবুর রহমান মেমোরিয়াল হাসপাতাল এখন আর কেবল একটি ভবন নয়। এটি একটি ভাবনা, একটি আন্দোলন—যেখানে মানুষের জন্য কিছু করার প্রাণান্ত প্রয়াস রয়েছে। এই হাসপাতাল দেখিয়ে দিয়েছে, সত্যিকারের ইচ্ছা, সহানুভূতি এবং দায়বদ্ধতা থাকলে একটি ছোট এলাকা থেকেও জাতিকে বদলে দেওয়ার যাত্রা শুরু করা সম্ভব।
—
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
https://slotbet.online/