স্বাস্থ্য

চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর; পরিচিতি, কার্যক্রম ও পরিকল্পনা

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
প্রতিবেদক · রবিবার, ১৭ আগস্ট ২০২৫ · ১:২৯ পিএম

চিকিৎসা সেবায় সহযোগিতা—ইবাদত ও মানবতার শ্রেষ্ঠতম রূপ:

সুস্থতা—এ এমন এক নিয়ামত, যার প্রকৃত মূল্য কেবল অসুস্থতায় ক্লান্ত হৃদয় ও ব্যথাতুর শরীরই অনুভব করতে পারে। এক গ্লাস পানি যখন ক্যানসার-আক্রান্ত কারো গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়, এক ফোঁটা ওষুধ যখন অর্থাভাবে অধরাই থেকে যায়—তখন সুস্থ মানুষের ধন-সম্পদের গুরুত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষার রূপ ধারণ করে।
এই পরীক্ষার উত্তরণ ঘটে তখনই, যখন কোনো বিত্তবান ব্যক্তি বা এই টাইপের কোনো সংস্থা দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার খরচ বহনের দায়িত্ব নেন; যখন কোনো সহৃদয় মানুষ পকেটের মূল্যবান অংশটি তুলে দেন একটি জীবন বাঁচানোর আশায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তাদের ধনে রয়েছে হক—প্রার্থী ও বঞ্চিতের জন্য।”
(সূরা যারিয়াত: ১৯)
এ আয়াত আমাদের শেখায়—ধন শুধু উপভোগের জন্য নয়; তা হল বঞ্চিতের মাঝে ভাগ করে দেওয়ার জন্য, আর্তনাদের মাঝে আশার আলো জ্বালানোর জন্য, যেন একেকটি সাহায্য হয়ে ওঠে একেকটি জীবন ফেরানোর দীপ্ত স্পর্শ।
আজকের পৃথিবীতে চিকিৎসা যেন এক দুর্লভ পণ্য। গরিব মানুষের জন্য এটি একটি বিলাসিতা, যা কেবল ইচ্ছা থাকলেই পাওয়া যায় না—চাহিদা থাকলেও কেবল টাকা দিয়েই কেনা যায়। হাসপাতালে শয্যা নেই, ওষুধের দাম আকাশছোঁয়া, চিকিৎসা প্রক্রিয়া জটিল ও ব্যয়বহুল। আর এইসব বাধার দেয়ালে প্রতিনিয়ত ধাক্কা খায় একেকটি অসহায় জীবন, একেকটি মা, একেকটি শিশু, একেকটি নিঃস্ব পিতা।
এই বিভীষিকাময় বাস্তবতা শুধুমাত্র একটি পরিবার নয়, একটি সমাজ, একটি প্রজন্মকেও দুর্বল করে তোলে। তাই সময় এসেছে—মানুষকে বাঁচাতে মানুষের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার।
অতএব চিকিৎসা সেবায় আর্থিক সহায়তা করা মানে শুধুমাত্র টাকা দেওয়া নয়; এটি একেকটি নিভু নিভু প্রাণে আশার আলো জ্বালানো। এটি শুধু দয়া নয়—এটি হলো খাঁটি ইবাদত, এক অফুরন্ত সওয়াবের সঞ্চয়।
এই সদাকার প্রভাব পৃথিবীতে সুস্থতা আর আখেরাতে মুক্তির বার্তা বয়ে আনে।
এখানে একটুখানি দান হয়তো কারো চোখে আলো ফিরিয়ে দেবে,
একটুখানি সহানুভূতি হয়তো কোনো পিতার কাঁধ থেকে বোঝা নামিয়ে দেবে,
আর একটুখানি ভালোবাসা হয়তো কাউকে মৃত্যুর মুখ থেকে জীবনের দিগন্তে ফিরিয়ে আনবে।

পরিচিতি ও কার্যক্রম::
সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী জনপদ তাহিরপুর—নৈসর্গিক সৌন্দর্য, জনপদীয় বৈচিত্র্য ও সীমিত স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতায় একটি অনন্য স্থান। এ অঞ্চলটি হাওর-বাওর, নদী ও পাহাড়ে পরিবেষ্টিত। এ জনপদের মানুষ বহু যুগ ধরে মৌলিক চিকিৎসা সেবার অভাবে মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এমন এক বাস্তবতায় ২০২৩ সালের ১লা অক্টোবর কিছু নিবেদিতপ্রাণ মানুষ মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে গড়ে তোলেন “চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর”—যা বর্তমানে তাহিরপুর অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবামূলক ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

প্রতিষ্ঠার পটভূমি::
এ ফাউন্ডেশনের আত্মপ্রকাশ ঘটে একদল আলোকিত মানুষ ও তরুণ সমাজহিতৈষীর উদ্যমে, যারা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে জনসাধারণের চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও সচেতনতাবিষয়ক সেবাকে এক ছাতার নিচে আনার প্রয়াসে এগিয়ে আসেন। ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয় সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে বিনামূল্যে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে।

নেতৃত্ব পর্ষদ: ক. প্রতিষ্ঠাতা শূরা সদস্যবৃন্দ

চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুরের সাংগঠনিক কাঠামো গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন একঝাঁক প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী ও সমাজসচেতন মানুষ—যাঁদের হৃদয়ে ছিল মানবতার জন্য নিবেদিত এক স্বপ্ন, আর চোখে ছিল একটি সেবাধর্মী সমাজের রূপকল্প। শুরুর সেই মহৎ অভিযাত্রায় তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন অটল ভিত্তির মতো, হয়ে উঠেছিলেন চিন্তা, পরিকল্পনা ও পথনির্দেশনার আলোকবর্তিকা।

প্রতিষ্ঠাতা শূরা সদস্যরা হলেন:
১. হাফিয মাওলানা আবু বাহরাম জুনাইদ আহমদ – ফাউন্ডেশনের প্রারম্ভিক দিকনির্দেশনায় এক স্বচ্ছ চিন্তাশীল নেতৃত্বের প্রতীক।
২. হাফিয ক্বারী মুহাম্মদ মামুনুর রশিদ – নিরবিচারে পরিশ্রম ও সমন্বয় সাধনের এক অদম্য প্রেরণা।
৩. মুফতি মুহাম্মদ নাজমুল ইসলাম – ফাউন্ডেশনের আদর্শিক রূপরেখা নির্মাণে এক মুখ্য চিন্তানায়ক।
৪. মাওলানা নাঈম আহমদ – তরুণ নেতৃত্বের বলিষ্ঠ কণ্ঠ, কর্মপরিকল্পনার একনিষ্ঠ বাস্তবায়ক।
৫. মুফতি মাহফুজ আহমদ রুম্মান (রাহ.) – আজীবন সমাজসেবায় নিবেদিত এক মহতপ্রাণ, যাঁর স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিটি ইটে ইটে জড়ানো।
৬. ডা. জাকির হোসেন (প্রতিষ্ঠাতা নন)– শূরা সদস্য হিসেবে চিকিৎসা কার্যক্রমের বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ ও সহায়তায় নিরবচ্ছিন্নভাবে অবদান রেখে চলেছেন।

এই মহতপ্রাণ ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে গঠিত শূরা কমিটি ছিল সংগঠনের বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড—যাঁদের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও মানবিক চেতনা আজও ফাউন্ডেশনের প্রতিটি ধাপকে প্রেরণা জোগায়।

খ. কার্যকরী কমিটি: চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর-এর পরিচালনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগি নিবেদিত প্রাণ আরো কিছু তরুণ রয়েছেন কার্যকরী সদস্য হিসেবে–
১. মাওলানা মেরাজ বিন আশকর
২. বায়েজিদ তালুকদার।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ
চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর-এর মূল চালিকাশক্তি হল একটি গভীর আধ্যাত্মিক ও মানবিক চেতনাবোধ। আমাদের সকল কর্মতৎপরতার মূল লক্ষ্য—
১. সর্বপ্রথম ও সর্বাগ্রে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। এ লক্ষ্যে আমরা মানবতার সেবাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়ে গ্রহণ করি।
২. তাহিরপুর উপজেলার হতদরিদ্র, অসহায় ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—বিশেষত যারা কঠিন, জটিল ও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। তাদের আংশিক বা পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় বহনের মাধ্যমে আর্থিক ও মানসিক শান্তি এনে দেওয়া।
৩. নির্বাচিত রোগীদের জন্য বাদাঘাট বাজারস্থ চিকিৎসকদের সহযোগিতায় ভিজিট ফিতে ৫০% ছাড় নিশ্চিত করা, যেন প্রাথমিক চিকিৎসা সবার জন্য সহজলভ্য হয়।

কারা চিকিৎসা সেবা পাবেন?

ফাউন্ডেশন চিকিৎসাসেবা প্রদান করে বাছাই করে সত্যিকারের অসহায় ও অগ্রাধিকারযোগ্য রোগীদের। এই বিবেচনায়—
১. রোগীকে হতে হবে অসহায়, দরিদ্র ও অসচ্ছল।
২. রোগের প্রকৃতি হতে হবে কঠিন ও জটিল, যার চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ ক্ষমতার বাইরে।
৩. শূরা কমিটির সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত—কে এই সহায়তার উপযুক্ত, তা নির্ধারণের পূর্ণাধিকার কেবল তাদের হাতেই।

সদস্য হওয়ার যোগ্যতা:

এই সংগঠনের সদস্য হতে হলে শুধু কোনো নাম মাত্র আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন এক অন্তরঙ্গ দায়বদ্ধতা, এক আত্মিক দৃঢ়তা। একজন সদস্যের বৈশিষ্ট্য হবে
১. হতে হবে দ্বীনদার ও মানবদরদী, যার হৃদয় কাঁদে মানুষের দুঃখে।
২. প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে (বা শূরা কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত মাসে) ১,১০০ বা কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত টাকা ফাউন্ডেশন তহবিলে প্রদান করার মানসিকতা ও সময়মতো পরিশোধের আন্তরিকতা থাকতে হবে।
৩. শূরা কমিটির উপর পূর্ণ আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে—তাদের সিদ্ধান্তই ফাউন্ডেশনের জন্য শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবে।
৪. নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অপরের কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার থাকতে হবে।
৫. কোনো নির্দিষ্ট রোগীকে সাহায্য পেতে শূরা কমিটির উপর চাপ সৃষ্টি করা অনুচিত ও অনভিপ্রেত, এটি সদস্যতার নৈতিক শর্তের পরিপন্থী।

নীতিমালা ও শর্তাবলী:

১. নিঃস্বার্থ নিবেদনই আমাদের মূল চেতনা
চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক ও কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান। তাই এর সদস্যদের নির্ধারিত চাঁদা একান্তভাবেই সেবামূলক কাজে প্রদানযোগ্য; কোনো অবস্থাতেই তা ফেরতযোগ্য নয়।
২. সেবাই সাধনা—পরিশ্রমে নেই পারিশ্রমিকের প্রত্যাশাঃ
এখানে কাজ করার পূর্বশর্তই হলো—আত্মিক প্রশান্তির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মানসিকতা পোষণ করা।
৩. ভাবমূর্তি রক্ষাই দায়িত্বের প্রথম শর্তঃ
প্রত্যেক সদস্যকে সচেতনভাবে ফাউন্ডেশনের সম্মান ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সততার সঙ্গে জীবনযাপন করতে হবে।
৪. রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ—বিশুদ্ধতার

অঙ্গীকার:

ফাউন্ডেশনকে সকল প্রকার দলীয়, গোষ্ঠীগত কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সবাইকে এই বিষয়ে সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে হবে।
৫. সদস্যপদ ত্যাগ—নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়ঃ
কোনো সদস্য যদি ব্যক্তি ইচ্ছায় সদস্যপদ পরিত্যাগ করতে চান, তাহলে তাঁকে শূরা কমিটির জ্ঞাতসারে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন করতে হবে।
৬. দানকৃত অর্থ—আমানত হিসেবে গৃহীতঃ
ফাউন্ডেশনে প্রদত্ত অর্থ কখনোই ব্যক্তিগত মালিকানার দাবির বিষয় নয়। এটি একটি পবিত্র আমানত—সেবামূলক খাতে ব্যবহারের জন্যই সমর্পিত।
৭. নামের মর্যাদা—ব্যক্তিস্বার্থে নয়, জনকল্যাণে ব্যবহারের অঙ্গীকারঃ
ফাউন্ডেশনের নাম, পরিচিতি বা প্রভাব ব্যবহার করে কেউ কোনো ব্যক্তিগত লাভ বা স্বার্থসিদ্ধির প্রচেষ্টা চালাতে পারবে না।
৮. দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাই প্রকৃত সদস্যত্বের প্রমাণ।

প্রত্যেক সদস্যকে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব আন্তরিকতা, সময়ানুবর্তিতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে।
৯. মিটিংয়ে উপস্থিতি—ফাউন্ডেশনের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচায়কঃ
ফাউন্ডেশন কর্তৃক আহূত সভাসমূহে উপস্থিত থাকা সদস্যদের নৈতিক দায়িত্ব ও শৃঙ্খলার অংশ।
১০. শূরাতান্ত্রিক পরিচালনা—সমতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে পথচলাঃ
আমাদের ফাউন্ডেশনে প্রচলিত সংগঠনের মতো পদ-পদবী (যেমন সভাপতি, সেক্রেটারি) থাকবে না। বরং পরস্পরের পরামর্শ ও সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত শূরা কমিটির মাধ্যমেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
১১. আদর্শের সঙ্গে আপসহীনতা—শরিয়াবিরোধী সংশ্লেষের নিষেধাজ্ঞাঃ
কোনো সদস্য এমন কোনো প্রতিষ্ঠান বা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না, যা ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী।

এই নীতিমালাগুলো আমাদের ফাউন্ডেশনের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও স্বাতন্ত্র্যবোধের প্রতিফলন। প্রতিটি সদস্যের উচিত হবে এগুলো আত্মস্থ করা, হৃদয় দিয়ে পালন করা এবং সকল কর্মকাণ্ডে তা প্রতিফলিত করা।

সেবার স্রোতধারা: চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর-এর ২০২৪ সালের ব্যয় বিবরণ

মানবতা—এ এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের নাম। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থতার ভার লাঘবে একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এই সবকিছুই যেন সেই সৌন্দর্যের অন্তর্গত ঝলক। আর সেই আলো নিয়েই নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলছে চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর।
২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ছিল ফাউন্ডেশনটির কর্মব্যস্ততা, দরদ এবং দায়িত্বশীলতার এক বিশেষ অধ্যায়। সীমিত সামর্থ্য, অথচ অগাধ নিষ্ঠা ও ভালোবাসা নিয়ে ফাউন্ডেশনটির নিবেদিতপ্রাণ সাথীরা ছুটে চলেছেন তাহিরপুর অঞ্চলের প্রত্যন্ত পল্লী থেকে শহরতলির ক্লিনিকগুলো পর্যন্ত—যেখানে কেউ একজন কিডনির ব্যথায় কাতর, কেউ আবার দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করছে নীরবে। আমরা ছিলাম তাদের পাশে। ছিল আল্লাহর রহমত, ছিল আপনাদের দান।
চলতি বছরে যেসব খাতে আমরা সহায়তা পৌঁছে দিয়েছি, তার বিবরণ তুলে ধরা যাক গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্বের সঙ্গে—

১. ঘাগটিয়া, বাদাঘাটের রুজেদা বেগম দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খরচের অভাবে অসহায় দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর কষ্ট লাঘবের নিমিত্তে ৫,০৮০ টাকা অর্থ সহায়তা ফাউন্ডেশন থেকে প্রদান করা হয়।

২. কামড়াবন্দ, বাদাঘাটের সুরেজা বেগম ছিলেন আরেক অসহায় মুখ। পেটের আলসার রোগে আক্রান্ত এই নারীকে দুই দফায় সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। প্রথমে ৳১,২০০ মূল্যের ওষুধ এবং
৩. পরে আরও ১,০৭০ টাকা সমমূল্যের ওষুধ সরবরাহ করা হয়।

৪. মঞ্জুরুল হক, বড়ছড়ার এক তরুণ, হঠাৎ করেই আক্রান্ত হন অ্যাপেন্ডিসাইটিসে। জরুরি অপারেশন দরকার ছিল, কিন্তু হাতে ছিল না চিকিৎসার ব্যয়। সেসময় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৪,০০০ টাকা প্রদান করা হয়, যাতে নির্ভয়ে অপারেশন সম্পন্ন করতে পারেন তিনি।

৫. বড়গোপ, বড়দল উত্তর অঞ্চলের মাহমুদুল হাসান, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত এক সংগ্রামী যুবক। তার জন্য ২,৫০০ টাকা সমমূল্যের ঔষধ সরবরাহ করা হয়।

৬. চরগাঁও, বাদাঘাটের আব্দুল মালেক দীর্ঘদিন ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন হয় অপারেশনের। সেই সংকটময় মুহূর্তে ফাউন্ডেশন তার পাশে দাঁড়ায়, হাতে তুলে দেয় ৪,০০০ টাকা।

এছাড়াও ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক ও মৌলিক কার্যক্রম যেমন চিঠিপত্র, কলম, খাতা, প্রিন্টিং ইত্যাদির জন্য ৳১,০৬০ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

এই সব খরচের মোট হিসাব দাঁড়িয়েছে ১৮,৯১০ টাকা মাত্র আর ২০২৪ সালে মোট প্রাপ্ত অর্থ ছিল ২৩,৯০০ টাকা। সুতরাং বছর শেষে তহবিলে অবশিষ্ট ছিল ৪,৯৯০ টাকা।

তবে এখানে শেষ নয়,
এই বছরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন অধ্যায় ছিল আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠাতা শূরা সদস্য, হযরত মাওলানা মাহফুজ আহমদ রুম্মান (রাহিমাহুল্লাহ)-এর পুত্র মুহাম্মদ বিন মাহফুজ-এর চিকিৎসা সহায়তা। তাঁর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় সমাজের উদারহস্ত মানুষদের কাছ থেকে উত্তোলন করা হয় ১৬,৭৫০ টাকা এবং সেই অর্থ তাঁর চিকিৎসায় সম্পূর্ণভাবে ব্যয় করা হয়।
এইভাবে সবমিলিয়ে ২০২৪ সালে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৫,৬৬০ টাকা মাত্র।
এই হিসাব শুধু অঙ্ক নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে মানুষের মুখের হাসি, ব্যথার উপশম, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। আমরা কেবল হিসাব দিচ্ছি না, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি—মানবতার পাশে থাকার এক গভীর প্রতিশ্রুতির।

আলহামদুলিল্লাহ!
আমরা শুকরিয়া আদায় করি আমাদের প্রভুর কাছে, যিনি আমাদের এই সেবার পথে পরিচালিত করেছেন। এবং কৃতজ্ঞতা জানাই সকল দাতা, শুভানুধ্যায়ী ও সহকর্মীদের, যাঁরা এই চলার পথে আমাদের সাহস ও শক্তি যুগিয়েছেন। ভবিষ্যতেও ইনশাআল্লাহ এ যাত্রা চলবে—আরও প্রসারিত পরিসরে, আরও নিবেদিত প্রাণে।

সেবা প্রদান কার্যক্রম ২০২৫ সালেও অব্যাহত

চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর-এর সেবামূলক ধারাবাহিকতাঃ
মানবিকতা যখন লক্ষ্য, আর করুণার ছায়াতলে গড়ে ওঠে যাত্রা—তখন সময় আর সীমান্তের রেখা ম্লান হয়ে যায়।
চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর তেমনই এক যাত্রার নাম, যেখানে প্রতিটি সাহায্যের হাত মানুষের মুখে ফেরায় বাঁচার আশা, বাঁচার স্বপ্ন।
২০২৫ সালেও সংগঠনটি তার মানবিক অঙ্গীকারে অবিচল। বছরের সূচনালগ্ন থেকেই সমাজের প্রান্তিক, অসহায় ও চিকিৎসা-নির্ভর মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছে নতুন উদ্যমে, নতুন আস্থায়।

১লা জানুয়ারি ২০২৫

নতুন বছরের ভোরে, শীত আর অসুস্থতার দ্বৈত-আঘাতে বিপর্যস্ত এক জীবন—তাহিরপুর সদরের চিকসা গ্রামের টিভি আক্রান্ত মনফর আলী। তাঁর যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনযুদ্ধে একটুখানি স্বস্তি দিতে সংগঠনটি এগিয়ে আসে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে। তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রদান করা হয় নগদ ২,০০০ টাকা, যা ছিল তার চিকিৎসাপথে প্রথম এক দীপ্ত আলো।

২৩ জানুয়ারি ২০২৫
বড়গোপ, বড়দল উত্তর গ্রামের মাহমুদুল হাসান, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত এক যুবক। জীবন যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট হয়ে পড়া এই তরুণের চিকিৎসায় সহায়তা দিতে ফাউন্ডেশনটি তাঁর হাতে তুলে দেয় নগদ ৫,০০০ টাকা—যেন তার পথচলা থেমে না যায় অর্থের অভাবে।

৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

চিকিৎসা চলমান, কিন্তু ব্যাধি প্রবলতর। আবারও এই মাহমুদুল হাসানের শারীরিক অবস্থা অবনতি ঘটলে, নগদ ১০,০০০ টাকা প্রদান করে ফাউন্ডেশনটি তার চিকিৎসা ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করে। এই সাহায্য যেন ছিল একটি শব্দহীন প্রার্থনা—“বাঁচো, ভাই! বাঁচো আবার নতুন করে।”

১১ এপ্রিল ২০২৫

হলহলিয়া চরগাঁও গ্রামের এক নিষ্পাপ শিশু, আগুনে দগ্ধ হয়ে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নাম তার তাসলিমা আক্তার। তার জ্বলন্ত শরীরের যন্ত্রণার চেয়ে যেন বেশি কাঁদিয়েছে তার নিরুপায়ত্ব। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে শিশুটির চিকিৎসার জন্য নগদ ৭,৫০০ টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়। এ সহায়তা শুধু টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না—এ ছিল ভালোবাসা, মমতা, এবং একটি শিশুকে ফের বাঁচিয়ে তোলার নীরব আহ্বান।

১১ জুন ২০২৫

মানিগাঁও গ্রামের হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা
সম্প্রতি তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁও গ্রামে, ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা।
এই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন পারভেজ আহমদ নামে এক অসহায় ব্যক্তি, মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায় তার, যিনি এখন শয্যাশায়ী, যন্ত্রণাক্লিষ্ট। চিকিৎসার ব্যয়ভার তার পরিবারের পক্ষে বহন করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।

এই আহত ব্যক্তির চিকিৎসা সহায়তায় ফাউন্ডেশনটি তাকে নগদ ৯,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।

চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর আবারও প্রমাণ করেছে, তারা শুধু রোগ নয়—ভগ্ন মন, ভাঙা বুক ও বিপন্ন পরিবারগুলোর জন্যও এক আশ্রয়।

সমাপ্তি নয়, চলমান প্রতিশ্রুতি-
এই কিছু ঘটনা মাত্র একটি বছরের শুরুতে। আমাদের পথচলা চলমান—জীবনের শেষ অবধি।
আমরা বিশ্বাস করি—একটি সহানুভূতির হাত, একটি করুণার দৃষ্টি ও একটি ছোট সহায়তা কাউকে ফেরাতে পারে মৃত্যুর দুয়ার থেকে।
আল্লাহ তায়ালা যেন সকল রোগীকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন, এবং আমাদের এই প্রচেষ্টাকে তাঁর দরবারে কবুল করে নেন—
আমিন, ছুম্মা আমিন।

আমাদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:

মানবতা যখন ব্যথিত, সমাজ যখন অবহেলিত, আর চিকিৎসা যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে—তখনই প্রয়োজন হয় একটি দয়ামাখা, আন্তরিক ও সুপরিকল্পিত প্রয়াস।
চিকিৎসা সেবা ফাউন্ডেশন তাহিরপুর তার সূচনালগ্ন থেকেই এই অভাববোধকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে।

নিচে আমাদের কিছু মূল পরিকল্পনা তুলে ধরা হলো:

১. অসহায় ও গরীব রোগীদের জন্য ব্যাপক চিকিৎসা-সেবা:

আমাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে—
ক. অসহায়, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আনা।
খ. বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা
গ. স্থানীয় গ্রামে গ্রামে মেডিকেল ক্যাম্প
ঘ. প্রয়োজনীয় রেফার ও সহায়তা ব্যবস্থা

২. অলাভজনক ফার্মেসী প্রতিষ্ঠা
ক. বাণিজ্যিক লাভ নয়—আমাদের উদ্দেশ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
খ. ন্যায্য মূল্যে মানসম্মত ওষুধ
গ. গরীব রোগীদের জন্য ভর্তুকি বা ফ্রি মেডিসিন
ঘ. সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ফার্মেসিকেন্দ্রিক হেলথ কাউন্সেলিং

৩. এ্যাম্বুলেন্স সেবার বাস্তবায়ন

দুর্গম এলাকার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম বাধা হচ্ছে এ্যাম্বুলেন্সের অনুপস্থিতি।
ক. একটি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা
খ. বিশেষ ছাড়ে অসহায় রোগীদের বহন
গ. ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা

৪. একটি সেবামূলক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা

ক. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা একটি পরিপূর্ণ, সুসজ্জিত ও মানবসেবায় নিবেদিত হাসপাতাল গড়ার চিন্তা প্রতিনিয়ত মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
খ. রোগনির্ণয়, অপারেশন ও শিশু-মাতৃসেবা
গ. ইসলামিক মূল্যবোধসম্পন্ন নার্সিং ও সেবাদান
ঘ. দুঃস্থ রোগীদের জন্য ফ্রি বেড ও ফান্ডিং সিস্টেম

পরিশেষে…

এই সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পেছনে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তা হলো আল্লাহর তৌফিক, আর তারপর আপনাদের আন্তরিক অংশগ্রহণ ও দোয়া।

তোমরা পাশে থাকো, আমরা একসঙ্গে গড়ি একটি মমতাময় স্বাস্থ্যসমাজ।

“যে ব্যক্তি মানুষের উপকারে আসে, সে-ই মানুষের মধ্যে উত্তম।”
— হাদীস শরীফ

সম্পর্কিত সংবাদ