আমাদের রায়বাঙ্গালী শাহজালাল রহ. দাখিল মাদরাসার স্বর্ণযুগ ছিল স্যারের সময়কাল। বিশেষত ২০০০ এর পর থেকে ২০১২-১৩ সাল পর্যন্ত জনাব জিয়াউর রহমান (বিএসসি) স্যার আমাদের আশা-ভরসার নাম ছিলেন। সাধারণত মাদরাসা শিক্ষার্থীরা গণিতে দুর্বল থাকেন। তাও আমাদের রায়বাঙ্গালীর মতো অজোপাড়া গায়ে মাদরাসায় গণিতে মোটামুটি ভালো থাকে দুই ধরণের ছাত্র। ১. যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ মেধার অধিকারী, ২. যারা ছোটোকাল থেকেই হোম টিচারের গাইডে থাকে। এই দুই টাইপের ছাত্র গ্রামাঞ্চলে ১০% থাকে। প্রায় প্রতি বছর গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থী ফেল করার ৯৯% কারণ থাকে ইংরেজি/গণিতে দুর্বল। চিত্র এখনো পাল্টায়নি।
আমাদের জিয়াউর রহমান স্যার সেই ধারণাটাই পালটে দিয়েছিলেন। এমনও হয়েছে লাগাতার কয়েক বছর দাখিলে কোনো শিক্ষার্থীই গণিতে ফেইল করেনি। বরং অনেক ভালো রেজাল্ট হতো গণিতে। খুবই মিশুক ও খোশমেজাজের আমাদের বিএসসি স্যার ছিলেন ছাত্র-শিক্ষক এমনকি গ্রামবাসীরও অনেক প্রিয়। স্যার দেখতে তেমন মোটাসোটা ছিলেন না। একটু খাটো টাইপের এই মানুষটি ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। ক্লাসের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল ছিলেন স্যার। স্যার থাকাকালীন প্রায় প্রতিটি ব্যাচের সিংহভাগ ছাত্র গণিতে ভালো ছিল।
আগের বছর সর্বোচ্চ A- রেজাল্ট ছিল যে মাদরাসায় সেখানে পরের বছর A+ নিয়ে আসার কৃতিত্ব দেখার স্যার তার তত্ত্বাবধানে থাকা ছাত্র Suhag Malik ভাইর মাধ্যমে। সোহাগ ভাইর সীমাহীন পরিশ্রম আর স্যারের সুপরামর্শ ও যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা আমাদের মাদরাসাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। যদি পরে কয়েক বছর A+ রেজাল্ট চলমান ছিল, তবে শুরুটা হয়েছিল আকাশছোঁয়ার স্বপ্নপূরণের মতো। যার শুরুটায় ছিল স্যারের অবদান।
আমি যখন দাখিল লেভেলে অধ্যায়নরত তখন আমাদের পারিবারিক স্বচ্ছলতা তেমন ছিল না। যার কারণে ক্লাস টেন এ উঠার আগ পর্যন্ত কখনো প্রাইভেট পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। দাখিল পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার জন্য কিছুটা প্রাইভেট পড়া জরুরিই ছিল। সেক্ষেত্রে আমি পুরো সাপোর্ট পেয়েছি স্যারের কাছ থেকে। নামমাত্র সম্মানির বিনিময়ে স্যার প্রাইভেট পড়িয়েছিলেন। শুধু আমি না; আমার মতো আরো প্রচুর শিক্ষার্থীকে স্য্যার যে ইনসাফ দেখিয়েছেন তা অতুলনীয়।
স্যারের অংক করানোর ধরনের একটি উল্লেখযোগ্য ফায়দা পেয়েছি আমি দাখিল পরীক্ষার সময়। ক্লাসের ফার্স্ট বয় হিসেবে অন্যান্য শিক্ষার্থীর ভরসা ছিল আমার প্রতি। সেদিন আমার কমন পড়েছিল ৭৮ মার্ক। সামান্যর জন্য A+ মিস যাবে। তখন প্রশ্নের শেষেরদিকের একটা অংক দেখে হঠাৎ স্যারের ক্লাসের কথা মনে পড়ে গেলো। স্যার যে নিয়মে অংক করে দিয়েছিলেন তা থেকে কিছুটা ভিন্ন অংকটি ছিল। সাহস করে স্যারের দেয়া থিওরি এপ্লাই করলাম। অংকের ফিনিশিংও মিলে গেলো। নিজের ধারণার বাইরের একটি অংক স্যারের থিওরি মোতাবেক করে মোটামুটি কনফিডেন্স ছিলাম। আশপাশের কয়েকজনকেও এই অংকে হেল্প করলাম৷ রেজাল্টের পরে দেখলাম A+ মার্ক গণিতে। যা ছিল স্যারের ক্যারিশমাটিক পাঠদানের সুফল।
স্যার স্বাভাবিকত রাগ করতেন না। তবে অপরাধ মারাত্মক হলে অবশ্যই শাসন করতেন। ছাত্র-শিক্ষক সকলেই তাঁর কাছে বন্ধুসূলভ ব্যবহার পেতো। গ্রামের আমজনতাও স্যারকে নিজেদের আপনজন মনে করতো।
স্যার নিজ মেধা-মননে পদোন্নতির দাবীদার। তিনি এখন একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে অধিষ্ঠিত আছেন। যারা তাকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছে তারা এক একজন সুন্দর মানুষ হয়েই উঠেছে, আরো উঠবে।
স্যার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
https://slotbet.online/