মতামত

১৯৭১ এবং ২০২৪ : স্বাধীনতা অর্জন ও স্বাধীনতা রক্ষার দুই অধ্যায়

মাওলানা জাকারিয়া মাহবুব
মাওলানা জাকারিয়া মাহবুব
লেখক: · বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬ · ১০:৩১ পিএম

 

১৯৭১ এবং ২০২৪—বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একটি স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, অন্যটি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। ১৯৭১-এর ইতিহাস আমরা পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে তার বাস্তবতা জেনেছি। আর ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব আমরা নিজের চোখে দেখেছি, তার উত্তাল বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছি।

১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ৯ মাস এক সাগর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। আর ২০২৪ -এর ৩৬ জুলাই ( ৫ আগষ্ঠ) ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক মহাসাগর রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘঠিয়ে স্বাধীনতা রক্ষার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।

স্বাধীনতা অর্জন যেমন কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করা তার চেয়েও কঠিন। ১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, পরবর্তী পাঁচ দশকে সেই স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রামও কম কঠিন ছিল না। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অসংখ্য মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, মামলা, হামলা, গুম-খুন ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন—তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

তাই ২০২৪-এর আন্দোলন ও তার পূর্বাপর ইতিহাসও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে সংরক্ষিত হওয়া জরুরি। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যেন ইতিহাসের বয়ান পাল্টে না যায়। ইতিহাসকে কোনো দল, ব্যক্তি কিংবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর একক সম্পত্তিতে পরিণত করা উচিত নয়।

ইতিহাসের প্রতি ইনসাফ করতে হলে সত্য, দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি দলিল, পাঠ্যপুস্তক ও রাষ্ট্রীয় প্রকাশনায় ইতিহাসের নিরপেক্ষ ও তথ্যনিষ্ঠ উপস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
একসময় মহীউদ্দীন খান, মেজর রফিকুল ইসলাম, আফসান চৌধুরীর মতো ব্যক্তিরা ইতিহাসের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন ও গবেষণা করেছেন। তাঁদের অনুপস্থিতিতে আরিফ আজাদ, আবুল হাসান শামসাবাদী, শরীফ মুহাম্মদসহ বর্তমান প্রজন্মের লেখক, গবেষক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদেরও ইতিহাস সংরক্ষণের দায়িত্ব আরও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। আবেগ নয়—তথ্য, দলিল ও ইনসাফের ভিত্তিতেই ইতিহাসের ভাষ্য নির্মিত হওয়া উচিত।

ইতিহাস বিকৃতির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
ছোটবেলায় আমরা দাদা-নানা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের কাছ থেকে ১৯৭১-এর ইতিহাস শুনেছি। বড় হয়ে বইপুস্তকে সেই ইতিহাস পড়েছি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের উপস্থাপনেও নানা পরিবর্তন ও বিতর্ক লক্ষ্য করেছি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাকে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। একদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব, সাহসী ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; অন্যদিকে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা নিয়েও ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। এসব বিষয়কে দলীয় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দলিল, সাক্ষ্য ও গবেষণার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ইতিহাসের কোনো ব্যক্তির অবদান মূল্যায়ন করতে গিয়ে অন্যের অবদান অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও অবদান যেমন ইতিহাসের অংশ, তেমনি জিয়াউর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির অবদানও ইতিহাসের অংশ। একইভাবে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলিও ইতিহাসের আলোচনায় তথ্য ও প্রেক্ষাপটসহ স্থান পাওয়া উচিত।

কারণ ইতিহাস কারও প্রশংসাগাথা নয়, আবার কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগপত্রও নয়। ইতিহাস হচ্ছে জাতির আয়না—যেখানে সাফল্য, ব্যর্থতা, ত্যাগ, ভুল, অবদান ও বিতর্ক—সবকিছুরই ন্যায়সংগত প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
২০২৪-এর বিপ্লব ও কারও একার নয়
২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আবদুল্লাহসহ জুলাইয়ের নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-সমন্বয়কদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসার ছাত্র, পেশাজীবী, শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন ও সাহস জুগিয়েছেন। ফলে ২০২৪-এর আন্দোলনকে কেবল কোনো একটি দল, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির একক কৃতিত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এবং পরবর্তীতে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততায় রূপ নেওয়া একটি গণআন্দোলন।
তবে এটিও সত্য যে, রাজপথে জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে যারা সামনে থেকে আন্দোলন করেছেন, তাঁদের ত্যাগ ও সাহসকে খাটো করার কোনো সুযোগ নেই। জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ, আহত হওয়া, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং জীবন বাজি রেখে রাজপথে অবস্থান—এই সবকিছুই ২০২৪-এর ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
‘দফা এক, দাবি এক—শেখ হাসিনার পদত্যাগ’—এই স্লোগান ও আন্দোলনের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের ভূমিকা ছিল। জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের মধ্যে নাহিদ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল; ফলে তাঁকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব হিসেবে ইতিহাসে মূল্যায়ন করা স্বাভাবিক। তবে একটি বৃহৎ গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর কৃতিত্ব হিসেবে সীমাবদ্ধ করা ইতিহাসের ব্যাপকতাকে সংকুচিত করবে।
ইতিহাসের প্রতি ইনসাফই হোক আমাদের অঙ্গীকার
১৯৭১ আমাদের শিখিয়েছে—স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ত্যাগ ও রক্ত প্রয়োজন। ২০২৪ আমাদের আবার মনে করিয়ে দিয়েছে—অর্জিত স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্যও জনগণকে সচেতন ও সাহসী থাকতে হয়।
তাই ১৯৭১ ও ২০২৪—দুটোকেই বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখতে হবে। একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করা নয়; বরং উভয়ের বাস্তবতা, ত্যাগ, নেতৃত্ব, ভুল-ত্রুটি ও গণমানুষের ভূমিকা ন্যায়সংগতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত ইতিহাস না পড়ে—এ দায়িত্ব ইতিহাসবিদ, গবেষক, লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রের। বিশেষ করে সরকারি পাঠ্যপুস্তক ও রাষ্ট্রীয় প্রকাশনায় দলীয় বয়ানের পরিবর্তে তথ্যনির্ভর, গবেষণাসম্মত ও ইনসাফপূর্ণ ইতিহাস নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা এমন ইতিহাস চাই না, যেখানে বিজয়ী পক্ষই কেবল ইতিহাস লিখবে। আমরা এমন ইতিহাস চাই, যেখানে সত্য তার নিজস্ব শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে।
কারণ—
ইতিহাস কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়; ইতিহাস পুরো জাতির।
আর জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবি—সত্য, ন্যায় ও ইনসাফ।

~মাওলানা জাকারিয়া মাহবুব

সম্পর্কিত সংবাদ