মতামত

হক ও বাতিলের মাপকাঠি দলিল; ঐক্য, ক্ষমতা কিংবা নির্বাচনের সফলতা নয়

সৈয়দ মবনু
সৈয়দ মবনু
কবি ও গবেষক · বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ · ৮:৫৭ পিএম

 

হক ও বাতিল, সহীহ ও ভুল—এ নিয়ে আলোচনা উঠলে বাতিলপন্থীদের পক্ষ থেকে প্রায়ই কিছু পরিচিত প্রশ্ন আসে। তারা হকপন্থীদের বক্তব্যের দলিল খণ্ডন না করে প্রশ্ন করেন—
সহীহ আকিদার দাবিদাররা এত দলে বিভক্ত কেন?
তারা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন না কেন?
আকাবীররা একে অপরকে নেতা হিসেবে মেনে নিতে পারেন না কেন?
রাজনৈতিকভাবে তারা বিভক্ত—এটা কি তাদের হক না হওয়ার প্রমাণ নয়?
যারা নিজেদের মধ্যে একমত হতে পারে না, তারা কীভাবে সত্যের অনুসারী দাবি করে?
এ ধরনের প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হতে পারে—সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের মাপকাঠি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই এমন প্রশ্ন আসে। কিন্তু বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ; তাই কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
প্রথমেই প্রশ্নকর্তাদের কাছে আমাদের মৌলিক প্রশ্ন—
কোনো বিশ্বাস বা আকিদা সত্য হওয়ার মাপকাঠি কী—তার অনুসারীদের সংখ্যা, সাংগঠনিক ঐক্য, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নির্বাচনী সাফল্য; নাকি তার পক্ষে থাকা শক্তিশালী দলিল?
এখানেই পুরো বিতর্কের মূলকথা নিহিত।

১. হক নির্ধারিত হয় দলিলে, জনসংখ্যায় নয় :

সত্যের প্রশ্নে প্রথম এবং প্রধান বিষয় হলো—কথাটি সত্য কি না এবং তার প্রমাণ কী?
একজন মানুষ কোনো কথা বললেন, আর তার বিপরীতে এক হাজার মানুষ অন্য কথা বলল। এতে কি এক হাজার মানুষের কথাই সত্য হয়ে গেল?

– অবশ্যই নয়।

সত্য কোনো গণভোটের বিষয় নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্যে পরিণত করে না। ইতিহাসে বহুবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভুল ধারণার অনুসারী হয়েছে।
অতএব হক-বাতিলের বিতর্কে প্রশ্ন হওয়া উচিত—
‘আপনার বক্তব্যের দলিল কী?’
এর পরিবর্তে যদি প্রশ্ন করা হয়—
‘আপনাদের লোক এত কম কেন?’
‘আপনারা এত দলে বিভক্ত কেন?’
‘আপনারা নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ নন কেন?’
তাহলে মূল বিতর্ক থেকে সরে গিয়ে দলিলের পরিবর্তে সাংগঠনিক অবস্থাকে সত্য-মিথ্যার মাপকাঠি বানানোর চেষ্টা করা হয়। এটি যুক্তির বিচারে গ্রহণযোগ্য নয়।

২. ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ঐক্য সত্যের মাপকাঠি নয় :

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জরুরি।
ঐক্য ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা; কিন্তু ঐক্য কোনো মত বা আকিদার সত্যতার স্বতন্ত্র দলিল নয়।
মুসলমানদের পরস্পর ঐক্যবদ্ধ থাকা, বিভেদ পরিহার করা এবং আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই হকপন্থীদের মধ্যে অনৈক্য থাকলে সেটাকে আমরা ভালো বলছি না। বরং যেখানে অনৈক্য অন্যায়, সেখানে তা সংশোধন করা, পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক করা এবং ঐক্যের চেষ্টা করা কর্তব্য।
কিন্তু এখান থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না যে—
‘যেহেতু তারা ঐক্যবদ্ধ নয়, সেহেতু তাদের বক্তব্য সত্য নয়।’
এটি যুক্তিগতভাবে সঠিক নয়।
একজন মুসলমান মিথ্যা বললে ইসলাম মিথ্যা হয়ে যায় না। একজন মুসলমান নামাজে অলস হলে নামাজ ফরজ নয়—এ কথা প্রমাণ হয় না। তেমনি কোনো হকপন্থী মানুষের দুর্বলতা, ভুল কিংবা পারস্পরিক বিরোধ তার পেশকৃত দলিলকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দেয় না।

৩. হকপন্থীদের বিভক্তি মানেই হক বাতিল—এ ধারণা ভুল:

ধরা যাক, একই মূল আকিদা ধারণকারী কিছু আলেম রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো কিংবা কৌশলগত বিষয়ে মতভেদ করলেন।
এখন প্রশ্ন হলো—
তাদের মতভেদটি কি আকিদার মৌলিক বিষয়ে, নাকি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে?
এই পার্থক্য না করে অনৈক্যকে ‘আকিদার বিরোধ’ করার অনুপযোগী বলা একটি বড় ধরনের ভুল।
একই মূলনীতিতে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক কৌশল, নেতৃত্ব, নির্বাচন, জোট কিংবা সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতভেদ হতে পারে। এর দ্বারা তাদের সব ধর্মীয় বিশ্বাস বাতিল হয়ে যায় না।
বরং কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে দেখতে হবে—
কোন বক্তব্যের পক্ষে কুরআন, সুন্নাহ, সহিহ দলিল, সালাফের বক্তব্য এবং গ্রহণযোগ্য ইলমি ব্যাখ্যা রয়েছে? দলিলের শক্তি বিচার না করে শুধু মতভেদের উপস্থিতি দিয়ে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করা যায় না।

৪. ব্যক্তির ঐক্য নয়, সত্যের সঙ্গে তার অবস্থানই বিবেচ্য :

একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে রাখা দরকার—
মানুষ সত্যের মাপকাঠি নয়; সত্যই মানুষের মাপকাঠি। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে কতজন মানুষ আছে, তারা কতটা সংগঠিত, তাদের নেতা কতটা জনপ্রিয়—এসব দিয়ে তার বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারিত হয় না।
বরং দেখতে হবে—সে যে কথা বলছে, তা সত্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তার পক্ষে দলিল কতটা শক্তিশালী।
একজন মানুষ সত্য কথা বললে তার সঙ্গে কেউ না থাকলেও কথাটি সত্য থাকতে পারে। আবার হাজার মানুষ কোনো ভুল ধারণায় ঐক্যবদ্ধ হলেও তা সত্য হয়ে যায় না।

৫. ইতিহাসে হকপন্থীদের মধ্যেও মতভেদ হয়েছে :

ইসলামের ইতিহাসে আলেমদের মধ্যে ফিকহি ও ইজতিহাদি মতভেদ নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন বিষয়ে বড় বড় ইমাম ও মুজতাহিদদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে।
তাই কেউ যদি বলেন—
“তোমাদের আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে, অতএব তোমাদের কথা সত্য নয়,”
তাহলে এই যুক্তির ভিত্তি দুর্বল।
কারণ মতভেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে মতভেদ আছে; কিন্তু কোন মতটি সত্য—তা প্রমাণ করে না। সত্য নির্ধারণের জন্য আবারও ফিরতে হবে মূল জায়গায়—
দলিল কী?

৬. রাজনৈতিক ঐক্য তো আকিদার মাপকাঠি আরও নয় :

আজকের সময়ে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে সামনে আসে—
‘আপনারা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত; তাহলে আপনারা কীভাবে হকপন্থী?’
প্রশ্নটি শুনতে শক্তিশালী মনে হলেও এর মধ্যে একটি মৌলিক যুক্তিগত ভুল রয়েছে।
রাজনৈতিক ঐক্য কি কোনো আকিদার সত্যতার শর্ত? যদি রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকা কোনো আকিদার সত্যতার প্রমাণ হয়, তাহলে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত মুসলিম সমাজগুলোর আকিদার সত্যতা কীভাবে বিচার করা হবে?
রাজনীতি বহু ক্ষেত্রেই ইজতিহাদি বিষয়। একই আকিদা ও ধর্মীয় মূলনীতির মানুষ রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচন, জোট, নেতৃত্ব কিংবা দলীয় কর্মপদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন।
অতএব—
রাজনৈতিক বিভক্তি = আকিদা বাতিল
এমন কোনো স্বতঃসিদ্ধ সমীকরণ নেই।

৭. ক্ষমতা ও নির্বাচনী সাফল্যও সত্যের মাপকাঠি নয় :

এখানে আরও একটি বিষয় যুক্ত করা প্রয়োজন। কোনো দল ক্ষমতায় গেলেই কি তার সব বিশ্বাস সত্য হয়ে যায়?
কোনো দল নির্বাচনে বিপুল ভোট পেলেই কি তার আকিদা সহিহ হয়ে যায়?
কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেই কি তার মতাদর্শ সত্যের দলিল পেয়ে যায়?
– অবশ্যই নয়। নির্বাচনী সাফল্য রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি বাস্তব সূচক হতে পারে; কিন্তু তা আকিদার সত্যতার দলিল নয়।
অন্যদিকে কোনো সত্যবাদী মানুষ বা দল রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হলেই তার বক্তব্য বাতিল হয়ে যায় না।
সুতরাং হক-বাতিলের মাপকাঠিকে ভোটের বাক্স, রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।

৮. বিতর্কের কেন্দ্র যেন দলিল থেকে সরে না যায় :
যদি কেউ দাবি করেন—
‘এই আকিদা সহিহ।’ তাহলে প্রশ্ন হবে—
‘এর দলিল কী?’ আর কেউ যদি বলেন—
‘এই আকিদা বাতিল।’ তাহলেও প্রশ্ন হবে—
‘বাতিল হওয়ার দলিল কী?’
কিন্তু তার পরিবর্তে যদি বলা হয়—
‘ আপনাদের তো অনেক দল!’ ‘আপনারা নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ নন!’ ‘আপনাদের আলেমরা একে অপরকে নেতা মানেন না!’
‘আপনাদের রাজনৈতিক ঐক্য নেই!’
তাহলে এগুলো কোনো দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ব্যর্থতা বা পারস্পরিক বিরোধের অভিযোগ হতে পারে; কিন্তু এগুলো কোনো আকিদা সহিহ বা বাতিল হওয়ার প্রত্যক্ষ দলিল নয়।
এখানে বিতর্কের কেন্দ্রকে বারবার ফিরিয়ে আনতে হবে—দলিলের দিকে।

৯. একটি সহজ উদাহরণ :

ধরা যাক, একজন চিকিৎসক বললেন—একটি নির্দিষ্ট ঔষুধ একটি রোগের জন্য কার্যকর। আর দশজন চিকিৎসক বললেন—এটি কার্যকর নয়।
এখন সত্য নির্ধারণ হবে কী দিয়ে?
চিকিৎসকদের মধ্যে কে বেশি ঐক্যবদ্ধ—তা দিয়ে নয়। কে বেশি জনপ্রিয়—তা দিয়েও নয়। বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ, গবেষণা ও বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয়টি বিচার করা হবে। ধর্মীয় সত্যের ক্ষেত্রেও মূলনীতি একই—দলিল কার পক্ষে?

১০. হকপন্থীদের বিভক্তি থাকলে করণীয় কী?

এর অর্থ এই নয় যে হকপন্থীদের বিভক্তি নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না।
বরং যদি বিভক্তি অন্যায় হয়, তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। যদি অহংকার, নেতৃত্বের লোভ, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, দলাদলি কিংবা দুনিয়াবি স্বার্থের কারণে বিভক্তি হয়, তবে তা সংশোধন করা জরুরি। হকের অনুসারীদের উচিত—হকের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া, ভুল থাকলে সংশোধন করা, পারস্পরিক বিরোধ কমানো এবং সত্যের জন্য নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু এই সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাকে ব্যবহার করে হক-বাতিলের মাপকাঠিই বদলে দেওয়া যাবে না।
মোটকথা: হক হওয়ার মাপকাঠি সংখ্যা নয়। হক হওয়ার মাপকাঠি সাংগঠনিক ঐক্য নয়। হক হওয়ার মাপকাঠি রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়। হক হওয়ার মাপকাঠি নির্বাচনী সাফল্যও নয়।
এসবের কোনোটি সত্যের স্বতন্ত্র দলিল নয়।
হক হওয়ার মাপকাঠি হলো দলিল।
হকপন্থীরা বিভক্ত হলে তাদের সেই বিভক্তি ভুল হতে পারে; তা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তাদের বিভক্তি দিয়ে তাদের আকিদা বাতিল প্রমাণ করা যায় না।
অন্যদিকে বাতিলপন্থীরা সংখ্যায় বেশি হতে পারে, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে, নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারে কিংবা নিজেদের মধ্যে অত্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হতে পারে—তাতেও তাদের মত সত্য হয়ে যায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
‘কে কয়জন?’—এটি সত্যের প্রশ্ন নয়।
‘কার দলিল কী?’—এটাই সত্যের প্রশ্ন।
কারণ—সত্য মানুষ দিয়ে মাপা হয় না; মানুষকে সত্য দিয়ে মাপা হয়।
আর হক-বাতিলের চূড়ান্ত বিচারে তাই আমাদের দৃষ্টি হওয়া উচিত দলের দিকে নয়—দলিলের দিকে; সংখ্যার দিকে নয়—সত্যের দিকে; ক্ষমতার দিকে নয়—হকের দিকে।

লেখক: কবি ও গবেষক: ১৩ আগষ্ট ২০২৬

সম্পর্কিত সংবাদ