সাহিত্য

নীরবতার কবি, নিভৃত আলোকবর্তিকা: আমাদের মোয়াজ্জেম হোসেন আশিন (আমরিয়া)

আবদুর রহমান জামী
আবদুর রহমান জামী
প্রতিবেদক · রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ৯:১১ পিএম

 

কবি আশিন ভাই আমার পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় মানুষদের একজন ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক কবি হিসেবে কোনো আলো ঝলমলে খ্যাতি হয়তো তাঁর ছিল না; প্রচারের আলো থেকে নিজেকে তিনি সবসময় দূরেই রেখেছিলেন। কোনো সাহিত্য সভা কিংবা চায়ের কাপের আড্ডায় কখনো তাঁকে উচ্চকণ্ঠ হতে দেখেছি—এমন কথা কেউ হয়তো বলতে পারবেন না।

অথচ এই নিভৃতচারী মানুষটির প্রয়াণে অনেকেই আজ প্রকাশ্য ব্যক্তিগত বেদনার কথা বলছেন। এই অপূরণীয় ক্ষতি কি কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত? না, এই ক্ষতি আমাদের অঞ্চলের সাহিত্য পরিমণ্ডলের।

আমাদের এই হাহাকার ও হৃদয়বিদারক বেদনার সমবেত উচ্চারণের একটিই কারণ—তিনি ছিলেন এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করবেন: নিজের জন্য নয়, আশিন ভাই বেঁচে ছিলেন অন্যের কল্যাণে। নিজের কবিতা বা সাহিত্যকে প্রচারের আলোয় আনার চেয়ে অন্যদের লেখালেখি গড়ে তুলতে তিনি আনন্দ পেতেন।

  1. আমি নিজে তাঁর কাছ থেকে অজস্রবার নানাভাবে উপকৃত হয়েছি। প্রথম দিনের পরিচয়ে মাত্র কয়েক মুহূর্তের কথা। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত আলাপন থেকেই যে হৃদ্যতার সূত্রপাত, তা বিচ্ছিন্ন হলো কেবল তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে। আশিন ভাই ছিলেন আমার লেখার মেন্টর, আমার সাহিত্যগুরু এবং এক পরম সুহৃদ।

কত শত ভুল, কত ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আমি লিখেছি! কিন্তু একদিনও তিনি অধৈর্য হননি, গলা উঁচু করেননি। বরং গভীর মমতা ও স্নেহে আমার ভুলগুলো শুধরে দিয়েছেন, শিখিয়েছেন শব্দের ভেতরের আত্মাকে কীভাবে ছুঁতে হয়।

‘অক্ষর’-এর একটি সংখ্যা প্রকাশের আগে তাঁর হাতে পুরানো একটি কপি তুলে দিয়েছিলাম। প্রচ্ছদে পত্রিকার নাম দেখে মৃদু হেসে বলেছিলেন, “তোমার পত্রিকার নাম ‘অক্ষর’ রেখেছ বলে আগামী সংখ্যা প্রকাশের পর আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ থাকবে।”

কী সেই সারপ্রাইজ—তিনি তা খুলে বলেননি। আর সেই সারপ্রাইজ পাওয়ার সুযোগও তিনি আর দিলেন না। ‘অক্ষর’-এর নতুন সংখ্যা প্রকাশের ঠিক পরপরই পরিচিত একজনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টের মাধ্যমে তাঁর চলে যাওয়ার খবরটা পেলাম। স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এই নিঃশব্দ প্রস্থান আমাকে চরমভাবে আঘাত করে গেল!

যেকোনো আড্ডায় সবচেয়ে নিচু ও নম্র যে কণ্ঠটি শোনা যেত, সেটি ছিল আশিন ভাইয়ের। লক্ষ করেছি, এক অদ্ভুত অপ্রকাশিত বেদনায় তিনি নিজেকে মুড়ে রাখতেন। একধরনের আত্মিক বৈরাগ্য সবসময় তাঁকে ঘিরে থাকত। কী ছিল সেই গোপন বেদনা, কোন বেদনার আগুনে পুড়ে তাঁর ভেতরটা খাঁটি হয়েছিল—তা আর কখনো জানা হলো না।

  • আশিন ভাই হয়তো কোনো বড় পদক বা বিপুলখ্যাতির পিছে ছোটেননি, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে এবং নিঃশব্দ সাহিত্যচর্চায় যে প্রদীপের আলো তিনি জ্বেলে দিয়ে গেছেন, তা কখনো নেভার নয়।

আমার প্রিয় শিক্ষক ও বন্ধু কবি মোয়াজ্জেম হোসেন আশিন (আমরিয়া) ভাই।

 

সম্পর্কিত সংবাদ